এক সংখ্যালঘুর অব্যক্ত কান্নার কাহিনি। ধর্মের ভিত্তিতে সংখ্যালঘু একটি বাস্তবতা এ পৃথিবীতে। এখানে কেউ সংখ্যাগুরু, কেউ সংখ্যালঘু। আগমনে আপনার হাত নেই। আপনি কোথায় এলেন, কার বুকে স্থান পেলেন তার দায় আপনার নয়! অমর এই উপন্যাসের তেমন একটি চরিত্র। তার জন্ম ভারতে, না পাকিস্তানে- তা নির্ধারণ করার সুযোগ তার ছিল না। তার জন্ম হলো পাকিস্তানের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ঘরে, হিন্দু পরিবারে। জন্ম ভারতে হলেই তাকে বলা যেত সংখ্যাগুরুর সদস্য। কিন্তু না, সে হলো সংখ্যালঘু। শিক্ষা পেল, জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পেল। কিন্তু তারপরও তার অক্ষমতা কাটিয়ে উঠতে পারল না। তাকে জন্মস্থান ছাড়তে হলো। কিন্তু সংখ্যালঘুর সাইনবোর্ডটি তার পিছু ছাড়ল না। বাংলাদেশ তাকে সংখ্যালঘু পদবী দিয়েছিল। পালিয়ে গিয়ে কানাডাতে সেই সংখ্যালঘুর পদবীর বাইরে সে যেতে পারেনি। তার জীবনের ব্যর্থতার জন্য সে তার এ পরিচয়কেই দায়ী করেছে। তার মনে হয়েছে- তার সব ছিল, আবার তার কিছুই ছিল না।

তার শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, জ্ঞান দিয়ে যেভাবে সে ব্যর্থ হয়েছে একটি ভালো চাকরি পেতে বাংলাদেশে, ঠিক একইভাবে ভালো চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে কানাডাতে। তার সংখ্যালঘু পরিচয় সত্যই কি তাকে টেনে নিয়ে গিয়েছে অসাফল্যের দোরগোড়ায়? জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতে অমর তাই প্রশ্ন রেখে গিয়েছে। উপন্যাসের বিন্যাসে এটি একটি জীবন দর্শনের তথ্য; একটি জীবনবৃত্তান্ত। তবে এটা নিছক আত্মকথা নয়, সময়ের দলিলও। অমর যেকোনো দেশের সংখ্যালঘুর নাম। বাংলাদেশ, ভারত কিংবা কানাডা- সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থায় হয়তো-বা বিস্তর ব্যবধান। কিন্তু সংখ্যালঘুর জীবনব্যবস্থায় না পাওয়ার বেদনা, হাহাকার সর্বত্রই এক। শুধুু স্থানবিশেষে প্রায়োগিক অভিজ্ঞতা ভিন্ন। অমর তার অনুচ্চারিত চিৎকার দিয়ে প্রতিবাদ করতে চেয়েছে এই সংখ্যালঘু পরিচয়ের বিরুদ্ধে, এই অসম ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। অমর বলতে চেয়েছে- অমর কিংবা আফজাল কিংবা জন সবাই ধরাশায়ী হয়, যখন তারা ভুল জায়গায় গিয়ে পড়ে। সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার এহেন ভুল পরিপ্রেক্ষিতের ভিড়ে অমর অসম সমাজ লাভ করে বাংলাদেশে; আর আফজাল ভুলের মাশুল দেয় ভারতে। দিনশেষে তাদের সংখ্যালঘু পরিচয়টি তাদের কর্মজীবনের সফলতার পথ আটকে ধরে।

রাজনীতির দরবারে এর উত্তর হতে পারে সাম্প্রদায়িকতা কিংবা মেরুকরণের অভিশাপ। কেউ এ যুক্তি মেনে না-ই নিতে পারে। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে শুধুু তো অমরই বেকার থাকে না। এখানে হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার যুবক কিছু না করতে পেরে সংসারের বোঝা হয়ে দিন কাটাচ্ছে। তারা সবাই সংখ্যালঘুর দলে পড়ে না। তাদের মধ্যে বেশিরভাগটাই সংখ্যাগুরু দলের সদস্য। অমর তো বেকার ছিল না বাংলাদেশে। সে কিছু না-কিছু তো করেছে এখানে। তারপরও এমন অজুহাত কেন? অমর সেটাও ভেবে দেখেছে। কিন্তু তারপরও তার মুখে অভিযোগের সুর এসেছে। তার সংখ্যালঘু পরিচয়ের মনটাই যে তাকে অভিযোগ করার সুযোগ করে দিয়েছে। তাই তার অভিযোগ শুধুু বাংলাদেশ নিয়ে নয়, কানাডাতে গিয়েও তার অভিযোগের তীর সমানভাবেই চলেছে।